Skip to main content

ভিটামিনের অভাবে মানসিক সমস্যা

বাংলাদেশের বিশিষ্ট মনোশিক্ষাবিদ, মনোবিজ্ঞানী ও মনোচিকিৎসক
অধ্যাপক ডা. এ এইচ মোহাম্মদ ফিরোজ

মানসিক রোগ শিক্ষা, গবেষণা, চিকিৎসা ও জনসচেতনতায় পথিকৃৎ

একজন ডাক্তার কীভাবে বুঝবে যে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির বিষয়টি অনুসন্ধান করা দরকার। ২০ বছর বয়স থেকেই বিভিন্ন ধরনের কঠিন মানসিক সমস্যা দেখা দিতে পারে। নিউরোসাইকিয়াট্রিস্ট ফ্রেডারিক গগেনস এই ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, একজন বয়স্ক মানুষ যখন মানসিক সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে আসে, যার মানসিক সমস্যার পূর্ব ইতিহাস নেই, তখন আমি নিশ্চিত হই যে এটা ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিজনিত সমস্যা।

ভিটামিন বি১২-এর অভাবে হতে পারে
বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা যেমন-

  • অতিরিক্ত মাত্রায় স্মৃতিহ্রাস
  • অনুভূতিশূন্যতা এবং
  • অন্তর্দ্বন্দ্ব সমস্যা

ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতিজনিত কারণে মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে। খুব অল্প পরিমাণ ভিটাসিন বি৬ গ্রহণের ফলে ‘এসিটিলকোলিন’ নিউরোট্রান্সমিটার গঠনেও সমস্যা হতে পারে। ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকো স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকরা লক্ষ করেছেন যে, ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি ১২০ তদূর্ধ্ব মানুষের স্মৃতি বৈকল্য এবং বিমূর্ত ভাবনার দক্ষতা হারানোর বিষয়টির সঙ্গে সম্পর্কিত। হাসপাতালে ভর্তিকৃত মনস্তাত্ত্বিক রোগীদের ক্ষেত্রে রক্তে বি১২-এর নিম্নমাত্রা একটি গতানুগতিক ব্যাপার এবং তাদের পুষ্টি গ্রহণের জন্য পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে। ডাচ চিকিৎসক সিজ জে.এম. ভ্যান টিগেলেন বলেন, বি১২-এর ঘাটতিতে মস্তিষ্ক কম পরিমাণ গ্লুকোজ ব্যবহার করতে পারে এবং এসিটিলকোলিনের সংশ্লেষণও হয় কম। মারকারির মতো ভারী পদার্থ এবং কিছু নির্দিষ্ট দ্রাবকও রক্তপ্রবাহ থেকে মস্তিষ্কে ভিটামিনের যাত্রাপথকে বাধাগ্রস্ত করে। ভিটামিন বি১২-এর অভাবজনিত রোগ হচ্ছে পারনিসিয়াম অ্যানোমিয়া। এটা হয়ে থাকে দেহের হজমকারক এসিড উৎপাদনের ব্যর্থতায় বা ফুসফুসের অস্ত্রোপচারের কারণে, যার ফলে ভিটামিনটি খাদ্য থেকে অভিযোজিত হয় না। কিছু কিছু ওষুধ যেমন-

  • স্লোকে
  • এল্ডোমেট
  • নিওমাইসিন এবং
  • প্যারাঅ্যামিনোস্যালিসিলিক এসিড প্রভৃতির কারণে বি১২-এর ঘাটতি দেখা দিতে পারে। যারা মাছ, মাংস এবং দুগ্ধজাত খাবার খায় না তাদের বিপদ হতে পারে, কেননা বি১২ হলো একমাত্র ভিটামিন যা উদ্ভিদজাত খাদ্যে পাওয়া যায় না। যারা নিরামিষাশী তাদের সম্পর্কে বিজ্ঞানী শেলডন সৌল হোল্ডার সতর্কবাণী দিয়েছেন যে, তারা অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দুর্বলতাসহ যে কোনো ধরনের স্নায়বিক সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে এবং তখন তাদের সাধারণ সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করতে হবে। ভিটামিন বি১২ সাপ্লিমেন্ট মানসিক অসংলগ্নতার প্রতিষেধক নয়, যদিও

    সিগফ্রাইড ক্রাতার ‘এজিং মিথস’ বইতে লিখেছেন যে, আগেকার দিনে চিকিৎসায়-

  • দুর্বলতা
  • অসাড়তা
  • স্মৃতি হারানো বা
  • বিষণ্নতা রোগীদের অনেকটা হাল্কাভাবেই এই ভিটামিনটি দিয়ে থাকতেন, কিন্তু ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব মেডিসিনের অধ্যাপক ডা. ক্রা ভিটামিনের অপর্যাপ্ততার বিষয়টি প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত বি১২ ইনজেকশন রোগীদের জন্য পরামর্শ দিতেন না।

ফলিক এসিড হলো এক ধরনের বি ভিটামিন যা সবুজ পাতার শাকে প্রচুর পরিমাণে থাকে। উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার ফলে ফলিক এসিডের গুণাগুণ অনেকাংশেই নষ্ট হয়ে যায়-মন্তব্য করেছেন ভেনেজুয়েলান গবেষক লুইস এ অর্ডসনেজ তার নিউট্রিশন অ্যান্ড দ্য ব্রেইন বইতে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ১০ মিনিট রান্না করলে ৬৫% পুষ্টিগুণই নষ্ট হয়ে যায়। ফলিক এসিডের ঘাটতির কারণে-

  • খিটখিটে মেজাজ এবং
  • ভুলে যাওয়ার প্রবণতা সৃষ্টি হতে পারে।

ভিটামিন বি১৬ কে সঙ্গে নিয়ে ফলিক এসিড এসিটিলকোলিন উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, বার্ধক্যজনিত মানসিক সমস্যার কারণে ভর্তিকৃত রোগীদের শতকরা ৬২ ভাগ ফলিক এসিডের ঘাটতিতে ভুগছিল। ফলিক এসিডের ঘাটতি সৃষ্টি হতে পারে স্বল্প পুষ্টিজাতীয় খাদ্য গ্রহণ বা পুষ্টিকে হজম করার অসামর্থ্যতা থেকে। খাদ্য থেকে ফলিক এসিড অভিযোজিত হতে যেসব ওষুধ বাধা দেয় বলে দেখা গেছে তা হলো-

  • নিওমাইসিন
  • মেথোট্রেক্সেট
  • ডিলানটিন
  • ডায়াজিড
  • প্রিমারিন প্রভৃতি

কোলিন ভিটামিন বি এবং
মানসিক অবস্থা
কোলিন গবেষকদের বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। শুধু কোলিনের ওপরই নিউট্রিশন অ্যান্ড ব্রেইন (১৯৭৭) নামে রেফারেন্স সিরিজ বের হয়েছে। এই সিরিজের একজন লেখক জন এইচ গ্রোডন লিখেছেন, আলঝেইমার রোগ ও রোগীদের নিয়ে প্রাথমিক গবেষণায় যা পাওয়া গেছে তা অত্যন্ত আগ্রহোদ্দীপক। লেসিথিন এটি একটি সয়াবিনের উপকরণ যার মধ্যে উচ্চমাত্রার কোলিন আছে, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধিতে এটি সাহায্য করে। আলঝেইমার রোগীদের বেলায়ও এটি উপকারী, মানুষের বিভিন্ন ধরনের কাজে দক্ষতা বৃদ্ধিতেও এটি সাহায্য করে। সমাজের অধিকাংশ মানুষই এই প্রক্রিয়ায় উপকৃত হতে পারে। পুষ্টি গ্রহণের মাধ্যমেই বিভিন্ন ধরনের মারাত্মক মস্তিষ্ক বিকৃতি থেকে রক্ষা পাওয়া যেতে পারে বলে গবেষকরা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। কোলিনের রয়েছে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এটা স্পষ্টত মস্তিষ্কের বিপাকক্রিয়ার হার বৃদ্ধি করে।

এখান থেকেই মস্তিষ্ক এসিটিলকোলিন সৃষ্টি করে। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলোর মাঝে যোগাযোগ রক্ষার ক্ষেত্রে এই এসিটিলিনের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। খুব স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্যগত কারণেই বয়স বাড়ার সাথে সাথে কোলিন স্তরও নেমে যেতে থাকে। সবচেয়ে বেশি নিচু স্তরে থাকে আলঝেইমার রোগীদের ক্ষেত্রে (যা ভীমরতির পর্যায়ে উত্তীর্ণ) আর কোলিন পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করে (দুঃখজনক দ্রুত বিস্মৃতিপ্রবণতা রোধ করতে) দেখা গেছে। ১১ জন আলঝেইমার রোগী লিসিথিন গ্রহণ করার পর তাদের মধ্যে ৭ জনেরই বাস্তব উন্নতি হয়েছে। এমনকি যুবকেরাও কোলিন স্তর দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। একটি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে যে, কোলিন সাপ্লিমেন্ট স্মৃতিশক্তির উন্নতি ঘটিয়েছে। আরেকটা পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, ড্রাগ সেবনের মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে এসিটিলকোলিন স্তরকে অবদমিত করলে ছাত্র-ছাত্রীরা বিস্মৃতি প্রবণতায় ভোগে।

বৃদ্ধদের মধ্যে একটা বড় অংশ যারা এখনো জরাগ্রস্ততায় আক্রান্ত হয়নি প্রকৃতিগতভাবেই তাদের এসিটিলকোলিনের প্রভাব কমে যায়। কারণটি এখনো সুস্পষ্টভাবে জানা যায়নি। বয়স্কদের মস্তিষ্ক হয়তো শারীরবৃত্তীয় কারণেই নিউরোট্রান্সমিটারের সুবিধা নিতে কম সামর্থ্য থাকে। মস্তিষ্কের ভেতরকার কিছু রাসায়নিক উপকরণ হয়তো নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যকারিতাকে নষ্ট করে দেয়। ওহিয়ো স্টেটসের ডাক্তারের ধারণা, মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কোলিন বিস্তার করে একে দমিয়ে রাখতে পারে, বিশেষ করে মধ্যবয়স্ক থেকে। তার মতে, যাদের পিতা-মাতার আলঝেইমার রোগ আছে তাদের অবশ্যই প্রতিদিন নিয়মমতো কোলিন সাপ্লিমেন্ট সেবন করা প্রয়োজন। এসব সন্তানের অন্তত ৪০ ভাগেরই আলঝেইমার রোগে আক্রান্ত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে। তাই ডক্টররা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থেকে মুক্ত হতে তাদের ৩০-৪০ বছর বয়স থেকেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। বলা হচ্ছে না যে, প্রতিরোধমূলক শক্তি হিসেবে কোলিন সুপ্রমাণিত। তবে এখনো পর্যন্ত এর ভূমিকা সুপ্রতিষ্ঠিত, এই দৈনিক সাপ্লিমেন্টটি সারা বছরব্যাপী খেলে তা প্রয়োজনীয় পুষ্টির জোগান দিয়ে আপনাকে নিরাপদ রাখবে। কিন্তু একেবারে শেষ মুহূর্তে এই চিকিৎসা তেমন কাজে আসবে ধরে নেয়াই উচিত। ডক্টর মারভিস বলেন, মস্তিষ্ক যেহেতু ইতিমধ্যেই সুপ্রাপ্ত হয়ে গেছে তাই আপনি কোনো মিরাকল আশা করতে পারেন না। অবশ্যই আপনি ডাক্তারের পরামর্শ ব্যতিরেকে এ চিকিৎসা গ্রহণ করবেন না।

ভিটামিন বি প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও স্নেহজাতীয় খাদ্যকে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় জ্বালানিতে রূপান্তরিত করে, যা মন-মেজাজ নিয়ন্ত্রক রাসায়নিক উপকরণকে মস্তিষ্কে সংশ্লেষিত হতে সাহায্য করে। এ কারণেই বি ভিটামিনের ঘাটতির কারণে পেশির দুর্বলতা এবং মানসিক সমস্যা সামান্য উত্তেজনা থেকে ঘোরতর রূপ লাভ করতে পারে। যেমন-থিয়ামিন বা ভিটামিন বি১-এর অভাবে অবসন্নতার অনুভব সৃষ্টি হতে পারে। ভিটামিন বি১ মস্তিষ্কের অন্যতম প্রধান রাসায়নিক উপকরণ সৃষ্টি ও ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান আর সেই রাসায়নিক উপকরণটি হলো এসিটিলকোলিন। থিয়ামিন গবেষক গ্যারি ই গিবসন এ মন্তব্য করেন।

থিয়ামিনের বা ভিটামিন বি৩- এর
পর্যাপ্ততার অভাবে

  • বিষণ্নতা
  • আবেগগত ভারসাম্যহীনতা
  • সামপ্রতিক স্মৃতিভ্রংশতা হতে পারে। ক্যানাডিয়ান জার্নালে এন্ডারসন ও জন্সটন এ মতামত দিয়েছেন। কোনো শারীরিক উপসর্গ আসার আগেই এসব মানসিক প্রক্রিয়া লক্ষ করে থিয়ামিনের অভাবের বিষয়টি জানতে পারা যায়। থিয়ামিনের অতিরিক্ত ঘাটতিকে বলা হয় পেলাগ্রা। খুব কমই একজন মানুষ ভিটামিন বি৬ বা পাইরিডক্সিনের অভাবে ভুগে থাকে। তবে এটা কখনো কখনো ঘটে থাকে। স্বাভাবিকের চেয়ে মাত্রা বেশি হলেও ধারাবাহিক অসুখে ভুগতে পারে আবার ভিটামিন বি৬-এর সাথে কিছু নির্দিষ্ট ওষুধের যেমন-হাইড্রোজেন, কৃত্রিম রঙযুক্ত টারট্রাজিন, জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ি প্রভৃতির মিথস্ক্রিয়ায়ও সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে।

ভিটামিন বি৬- এর অভাবে

  • বিষণ্নতা
  • অতি উৎসাহ
  • শিশুদের আত্মসংবৃত্তি এবং
  • সিজোফ্রেনিয়ার মতো রোগ লক্ষণ দেখা দিতে পারে

ভিটামিন বি৬ মস্তিষ্কের দুটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক ট্রান্সমিটার ডোপামিন ও সেরোটনিন উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। মাছ, মাংস, তরমুজ, কলা প্রভৃতিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন বি৬ পাওয়া যায়।