Skip to main content

সিওপিডি : ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী রোগ

ডা. মো. নইমুল হক

বৈশ্বয়িক উষ্ণতা, জলবায়ু পরিবর্তন, ক্রমবর্ধমান পরিবেশ দূষণ এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে অসংক্রমণ ব্যাধি। যেমন-ডায়াবেটিস, হার্টের রক্তনালির রোগ প্রভৃতি। এ রোগ দুটির সাথে এ  দেশের সাধারণ মানুষ সুপরিচিত। কিন্তু ফুসফুসের একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ  রোগ, যাতে ভুগছে এ দেশের লক্ষ মানুষ, তা থেকে যাচ্ছে পর্দার অন্তরালে। ইংরেজিতে রোগটির নাম Chronic Obstructive Pulmonary Disease (COPD) যার বাংলা করলে দাঁড়ায় ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোধক রোগ।

ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোধক রোগ
এটি একটি প্রতিরোধযোগ্য এবং চিকিৎসাযোগ্য রোগ। ফুসফুসের বাইরে শরীরের অন্যান্য অংশকেও (মাংসপেশি, কিডনি, হাড় প্রভৃতি) এটি আক্রান্ত করে, যা রোগের ব্যাপকতা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফুসফুসের শ্বাসরোধক প্রক্রিয়াটি ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং তা মূলত হয়ে থাকে দূষিত শ্বাস গ্রহণের কারণে, ফুসফুসে সৃষ্ট প্রদাহের জন্য। এই প্রদাহের কারণে ফুসফুস দুভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়-

প্রথমত
ফুসফুসের ছোট ছোট শ্বাসনালির ভেতরের দেয়াল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, স্থায়ীভাবে সংকুচিত হয় এবং সেখানে অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি হয়ে বায়ুরোধক প্রক্রিয়াটি বাড়িয়ে দেয়।

দ্বিতীয়ত
ফুসফুসের বায়ুকুঠুরির (alveoli) অস্বাভাবিক প্রদাহের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এর ফলে শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে এর সংকোচন-প্রসারণ ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং রক্তে অক্সিজেনের প্রবাহ কমে যায়। ২০০৭ সালে অনুষ্ঠিত ন্যাশনাল সিওপিডি স্টাডি অনুযায়ী ৪০ বছর বয়সী জনসংখ্যার মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শতকরা ২১.২৪ ভাগ। সেই হিসাবে ফুসফুসের শ্বাসরোধক রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। পুরো জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই রোগের প্রাদুর্ভাব শতকরা ৪.৩২ ভাগ। আমাদের দেশে বক্ষব্যাধির জন্য একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল, জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউটে প্রতিদিন যে সংখ্যক রোগী ভর্তি হয়, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোধ রোগে (সিওপিডি) আক্রান্ত। এটি মারাত্মক রোগগুলোর মধ্যে চতুর্থ, যা পৃথিবীব্যাপী অধিকাংশ মৃত্যুর জন্য দায়ী। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে প্রশান্ত মহাসাগরীয় এশীয় দেশগুলোতে এ রোগে মাঝারি ও খারাপভাবে আক্রান্তের হার ৩.৫% থেকে ৬.৭% পর্যন্ত। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশ প্রতিবছর এই রোগের পেছনে সরাসরি খরচ করে প্রায় ১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং পরোক্ষভাবে খরচ হয় আরো ১৪ বিলিয়ন ডলার।

রোগের কারণ
এর প্রধান কারণ হলো-এই দেশে প্রতিনিয়ত বেড়ে যাচ্ছে ধূমপায়ীর সংখ্যা এবং পৃথিবীব্যাপী এটাই মূল কারণ। রোগটি যে শুধু ধূমপায়ীর নিজেরই হয় তা নয়, তারা আশপাশে নির্দোষ মানুষকেও আক্রান্ত করছে। অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান শিল্পায়ন এবং নগরায়ণের ফলে একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী রয়েছে ঝুঁকির মুখে। বিশেষ করে আমাদের শ্রমিক জনগোষ্ঠী যারা যথেষ্ট নিরাপত্তাব্যবস্থা না নিয়ে ক্রমাগত শ্বাসের সাথে টেনে নিচ্ছে কারখানার সৃষ্ট ধূলিকণা এবং রাসায়নিক দ্রব্য পুড়ে সৃষ্ট বাষ্প। অপরদিকে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের মহিলারাও আছেন বিপদের মধ্যে, বিশেষ করে যারা বদ্ধ ঘরে রান্নার কাজটি সারেন লাকড়ি কিংবা অন্য কোনো জৈব জ্বালানির মাধ্যমে। এছাড়া এই রোগের ক্ষেত্রে অন্য যে বিষয়গুলো বিশেষ প্রভাব বিস্তার করে থাকে তা হলো ক্রমাগত বয়স্ক লোকের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, ফুসফুস এবং শ্বাসনালিতে জীবাণুর সংক্রমণ হওয়া অথবা ফুসফুস ও যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হয়ে থাকলে এই রোগের সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায়।

শ্বাসরোধক রোগের লক্ষণ
আপনি যদি দীর্ঘদিন যাবৎ ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন, আপনার কর্মক্ষেত্রে যদি বায়ুদূষণের মাত্রা বেশি থাকে, আপনার বয়স যদি চল্লিশের বেশি হয়, আপনি যদি আলো-বাতাসহীন ঘরে রান্নার কাজ করতে অভ্যস্ত হয়ে থাকেন এবং এর সাথে যদি নিম্নলিখিত শারীরিক সমস্যাগুলো দেখা দেয়, তাহলে হয়তোবা আপনি ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোধক রোগে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক লক্ষণগুলো হলো-

১.    শ্বাসকষ্ট, যা ক্রমাগত বাড়তে থাকে, পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট আরো বেড়ে যায় এবং প্রতিদিনই অল্পস্বল্প শ্বাসকষ্ট থাকবেই
২.    রোগী প্রায়ই কাশিতে আক্রান্ত হয় এবং মাঝে মাঝে ক্রমাগত কফ তৈরি হতে থাকে।

আপনি যদি ঝুঁকিতে থাকা একজন ব্যক্তি হন এবং উপরিউক্ত শারীরিক লক্ষণগুলো (এক বা একাধিক) আপনার মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তবে অবশ্যই আপনার উচিত একজন বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে শ্বাস মাপন যন্ত্রের (স্পাইরোমিটার) মাধ্যমে শ্বাস মেপে নেয়া (যাকে বলে স্পাইরোমেট্রি) এবং এই প্রক্রিয়ায় আপনি নিশ্চিত হতে পারেন রোগটি সম্পর্কে।

এই ক্ষেত্রে মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনষ্টিটিউট ও হাসপাতালকে একটি বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে বেছে নিতে পারেন। এখানে রয়েছে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পরিমাপের পূর্ণাঙ্গ এবং সর্বোত্তম ব্যবস্থা। সেই  ক্ষেত্রে আপনাকে যোগাযোগ করতে হবে অ্যাজমা সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় অবস্থিত রেসপিরেটরি ল্যাবে।

চিকিৎসা না করার জটিলতা
১.    শ্বাসকষ্ট এতটাই বেড়ে যেতে পারে যে আপনি সামান্য পরিশ্রমেই শ্বাসকষ্টে ভুগতে থাকবেন। এমনকি আপনি দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষমতাও হারিয়ে বসতে পারেন যেমন-বাথরুমে যাওয়া, কাপড় পরা প্রভৃতি
২.    আপনার ফুসফুস দেহের অক্সিজেনের চাহিদা মেটানোর ক্ষমতা অথবা কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারে
৩.    ফুসফুসে অক্ষমতা থেকে হার্টের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে
৪.    মাঝে মাঝেই শ্বাসকষ্ট প্রচণ্ড রকম বেড়ে যেয়ে আপনি শয্যাশায়ী হয়ে যেতে পারেন, এমনকি হাসপাতালেও ভর্তি হতে পারেন
৫.    কদাচিত ফুসফুস ফেটে গিয়ে জীবন সংহারী অবস্থার উদ্ভব হতে পারে

কোন কোন রোগের সাথে আমরা
সিওপিডিকে গুলিয়ে ফেলতে পারি?
১.    অ্যাজমা/হাঁপানি
২.    হৃৎপিণ্ডের অক্ষমতা বা হার্টফেইলিউর
৩.    ফুসফুসের যক্ষ্মারোগ প্রভৃতি।
সিওপিডি রোগটি আমরা সবচেয়ে বেশি মিলিয়ে ফেলতে পারি অ্যাজমার সাথে। অ্যাজমা সাধারণত যে কোনো বয়সে হতে পারে। কিন্তু সিওপিডি সাধারণত ৪০ বছর বয়সের পর হয়ে থাকে। অ্যাজমার রোগীরা সাধারণত আক্রান্ত সময় ব্যতীত অন্যান্য সময়ে সম্পূর্ণ ভালো থাকে। কিন্তু এই রোগের  রোগীরা সব সময় কিছু না কিছু শ্বাসকষ্টে ভুগে থাকেন। সিওপিডি রোগীর ইতিহাস নিলে বোঝা যায়, তাদের প্রায় সবাই ধূমপান করেন অথবা কোনো না কোনোভাবে তারা বায়ুদূষণের শিকার। অপরদিকে অ্যাজমা রোগীদের ক্ষেত্রে পাওয়া যায় অ্যালার্জির ইতিহাস। এছাড়া শ্বাস মাপন যন্ত্রের মাধ্যমে আপনি নিশ্চিত হতে পারেন যে, আপনি অ্যাজমাতে ভুগছেন, নাকি ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোধক রোগে আক্রান্ত হয়েছেন।

চিকিৎসা নিলে আপনি কীভাবে উপকৃত হতে পারেন?
১.    রোগটির ক্রমাগত বাড়তে থাকার প্রবণতা কমে আসবে।
২.    ঘনঘন হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এড়াতে পারবেন।
৩.    অকাল মৃত্যু এড়ানো সম্ভব হতে পারে।
৪.    রোগে আক্রান্ত হয়েও কর্মক্ষম জীবনযাপন সম্ভব হতে পারে।

রোগটি কি প্রতিরোধযোগ্য?
অবশ্যই! পূর্বেই রোগটির পরিচিতির মধ্যে এ কথা বলা হয়েছে। আমরা সমন্বিতভাবে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো নিতে পারি-

১.    ধূমপান ছাড়তে হবে, ছাড়াতে হবে, প্রতিরোধ করতে হবে।
২.    পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনতে হবে, পরিবেশ দূষণকারী কলকারখানাগুলো শহরাঞ্চল থেকে সরিয়ে নিতে হবে।
৩.    কারখানার শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে
৪.    আপনার রান্নাঘরটিতে আলো বাতাস যাতায়াতের ব্যবস্থা থাকতে হবে

আসুন ফুসফুসের দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসরোধক পরাগের সাথে পরিচিত হই, নিজে ভুগছি কিনা জেনে নিই, দ্রুত চিকিৎসা শুরুর ব্যবস্থা নিই এবং রোগটি প্রতিরোধ করার জন্য সামাজিক উদ্যোগ গ্রহণ করি

পরিসংখ্যান কী বলে?
দুঃখের বিষয় রোগটির ব্যপকতা আমাদের দেশে বাড়তে থাকলেও সঠিক পরিসংখ্যান অনুপস্থিত।

লেখকঃ সহকারী অধ্যাপক
রেসপিরেটরি মেডিসিন
জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, মহাখালী, ঢাকা